‘ইসলামে যে কোনো কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ্ পড়ার গুরুত্ব’

‘ইসলামে যে কোনো কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ্ পড়ার গুরুত্ব’

0 177
(Symbolic Photo)a muslim woman reading islamic book

নিউজ ডেস্ক : بسم الله الرحمن الرحيم কয়েক বছর থেকেই দেখছি; এ বছর তো অনেক বেশি চোখে পড়ল যে, তালিবানে ইলম দরখাস্তের শুরুতে বিসমিল্লাহ লেখেন না। এতদিন শুনে এসেছি, কোনো কোনো মুরববী পূরা ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ লেখার পরিবর্তে ‘বিসমিহী তাআলা’ লিখতে উৎসাহিত করেছেন। তাঁদের ব্যাখ্যা এই যে, সাধারণভাবে এ ধরনের কাগজ হেফাযত করা হয় না। এ কারণে অনেক সময় তা পথে-ঘাটে, এমনকি নর্দমায়ও পড়ে থাকে। ফলে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ এর, যা কুরআন মজীদের একটি আয়াত, অমর্যাদা হয়ে থাকে। এ কারণে ‘বিসমিল্লাহ’র স্থলে ‘বিসমিহী তাআলা’ লেখা উচিত। কিন্তু আফসোসের বিষয় এই যে, অধিকাংশ তালিবে ইলম এখন ‘বিসমিহী তাআলা’ও লেখেন না। এ বছর দাখেলা ফরমের দরখাস্তগুলো দেখে আমার এমনই মনে হয়েছে। এই মুতাওয়ারাছ ও মানসূস আলাইহি সুন্নতের বিষয়ে এই অবহেলা কেন তা বুঝে আসে না। আম মানুষকে অনেক সময় দেখা যায়, সুনানে হুদা ও সুনানে মাকসূদা সম্পর্কে উদাসীন, কিন্তু ইযাফী সুন্নত সম্পর্কে, যা মোবাহ কাজের অন্তর্ভুক্ত, খুব তৎপর! ‘ইযাফী সুন্নত’ অর্থ ঐসব মোবাহ কাজ, যেগুলোকে আম মানুষ সুন্নত মনে করে থাকে। এগুলোকে সুন্নতের মতো গুরুত্ব দেওয়া হলে তা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হবে। শরীয়তে যেমন কোনো সুন্নত বর্জিত হওয়া-নাউযুবিল্লাহ- কাম্য নয়। তেমনি এমন কিছুকে সুন্নত সাব্যস্ত করাও কাম্য নয়, যা প্রকৃতপক্ষে সুন্নত নয়। সুন্নত বর্জন বা সুন্নত উদ্ভাবন কোনোটাই গ্রহণযোগ্য নয়। যাই হোক, আমি চিন্তা করতে বাধ্য হলাম যে, তালিবানে ইলমের মাঝে আলোচিত সুন্নতের বিষয়ে, যা খালিস সুন্নতে মাকসূদা, এই অবহেলা এত ব্যাপক কেন হয়ে গেল। ফতোয়া উছমানী খন্ড ২, পৃষ্ঠা ১৬৪ তে উস্তাযে মুহতারাম হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ তকী উছমানী দামাত বারাকাতুহুমের একটি ফতোয়া আছে, যা ১০/৫/১৩৯১ হিজরীতে লিখিত। তাতে হযরত লিখেছেন, চিঠিপত্রের শুরুতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম লেখা মাসনূন এবং তা কুরআন মজীদ দ্বারা প্রমাণিত। কুরআন মজীদে আছে হযরত সুলায়মান আ. এর চিঠি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম দ্বারা শুরু হত। বিসমিল্লাহর পরিবর্তে ৭৮৬ সংখ্যাটি কখন থেকে লেখা শুরু হয়েছে তা কোনো নির্ভরযোগ্য কিতাবে চোখে পড়েনি। তবে এর কারণ সম্ভবত এই যে, বিসমিল্লাহ লিখিত কাগজ কোনো অসম্মানের জায়গায় ব্যবহৃত হলে তার অমর্যাদা হবে। তাই কেউ যদি একথা চিন্তা করে মুখে বিসমিল্লাহ পাঠ করে এই সংখ্যা লিখে দেয় তাহলে সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। তবে পরিষ্কারভাবে বিসমিল্লাহ লেখাই উত্তম মনে হয়। কাণ হযরত সুলায়মান আ.-এর চিঠিপদত্র কাফিরদের কাছে গিয়েছিল। তেমনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও কাফির বাদশাহদেরকে যে পত্র পাঠিয়েছিলেন তাতেও বিসমিল্লাহ লেখা ছিল। বলাবাহুল্য, মুসলমানদের চেয়ে কাফিরদের মাধ্যমে অমর্যাদার আশঙ্কা বেশি ছিল, কিন্তু এ কারণে বিসমিল্লাহ ত্যাগ করা হয়নি। এই ফতোয়ার উপর হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী রাহ. একটি মন্তব্য লিখেছেন, যার খোলাসা হল, ‘জওয়াব সহীহ, তবে শর্ত এই যে, চিঠির অমর্যাদা হবে না-এই ধারণা প্রবল হতে হবে।’ প্রশ্ন এই যে, মাদরাসার পরিবেশে কাগজের অমর্যাদা কীভাবে হবে? এখানে তো যে কোনো কাগজ, সাদা হোক বা যেকোনো কিছু লিখিত, অমর্যাদা থেকে রক্ষা করা অতি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম। যা সালাফ থেকে তাওয়ারুছের সাথে চলে আসছে। এটা ঠিক যে, অন্যান্য আদবের মতো কাগজের আদবের বিষয়েও তালিবানে ইলমের মাঝে অবহেলা ব্যাপক হতে চলেছে। কিন্তু এর সংশোধনের পন্থা এই নয় যে, অপরাগ হয়ে একটি সুন্নতে মাকসূদাকে ছেড়ে দেওয়া হবে বা ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হবে। বরং চিকিৎসার উপায় এই যে, এই অবহেলা দূর করার চেষ্টা করা এবং উৎসাহ ও শাসন দু’ভাবেই তালিবানে ইলমের মাঝে কাগজপত্র ও ইলমের উপায়-উপকরণের আদব রক্ষার অনুভূতি ও অভ্যাস গড়ে তোলা। মোটকথা, তালীম-তাআল্লুমের পরিবেশেও যদি বিসমিল্লাহ লেখা কাগজের অমর্যাদা হওয়ার ছুতায় এই সুন্নত বর্জন করা হয় তাহলে এই সুন্নতের উপর আর কে আমল করবে এবং কোথায় করবে? দাখেলার দরখাস্ত তো মাদরাসার দফতরে দাখেলা সংক্রান্ত ফাইলে সংরক্ষিত থাকে। এখানে এমন অমর্যাদার আশঙ্কা কোথায় যে, নববই ভাগ তালিবে ইলমের দাখেলা দরখাস্ত বিসমিল্লা-শূন্য হতে হবে? তবে তো দরখাস্ত এত সতর্কতার সাথে লিখতে হবে যে, তাতে কোথাও কোনোভাবে আল্লাহর নাম না আসে! কারণ আল্লাহর নামের অমর্যাদাও তো হারাম। হযরত মাওলানা মুফতী রশীদ আহমদ লুধিয়ানুবী রাহ.-এর খেদমতে নিম্নোক্ত ইসতিফতা পেশ করা হয়েছিল : প্রশ্ন : পত্র-পত্রিকায় কুরআন মজীদের আয়াত, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, হাদীস শরীফ ইত্যাদি লেখার প্রচলন আছে। অথচ ঐসব পত্রিকায় ছবি থাকে, সিনেমার বিজ্ঞাপন থাকে। এরপর পুরানো কাগজে বিক্রি হয়ে যায়। এর দ্বারা দোকানদাররা গ্রাহকদেরকে জিনিসপত্র মুড়িয়ে দেয়। তদ্রূপ পুরানো পত্রিকা এখানে সেখানে পড়ে থাকে। পায়ের নীচে পড়ে। এ অবস্থায় পত্রিকায় আয়াত-হাদীস লেখা জায়েয হবে কি? তাছাড়া কিছুদিন যাবৎ সরকারী দফতরে সরকারী চিঠিপত্রে পুরা বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম লেখা হচ্ছে। এই কাগজগুলোরও উপরের অবস্থা হয়ে থাকে। তো এই সকল চিঠিপত্রে কি বিসমিল্লা লেখা জায়েয হবে? পুরা বিসমিল্লাহর স্থলে যদি বিসমিহী সুবহানাহু ওয়া তাআলা বা বিসমিহী তাআলা কিংবা ৭৮৬ লেখা হয় তাহলে সুন্নতের ছওয়াব পাওয়া যাবে কি না? হযরত মুফতী ছাহেব উপরের প্রশ্নের এই জবাব দিয়েছেন: ‘বর্তমানের পত্রপত্রিকা ও বিজ্ঞাপনে (যার অবস্থা প্রশ্নে বলা হয়েছে) কুরআন মজীদের আয়াত ও বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম লেখা জায়েয় নয়। সরকারী দাফতরিক কাগজপত্রে লেখা জায়েয; বরং মুস্তাহসান (ভালো)। কেউ অমর্যাদা করলে সে গুনাহগার হবে। বিসমিল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ বা ৭৮৬ লেখা কুরআনে কারীম, আল্লাহর রাসূলের আমল ও উম্মতের মুতাওয়ারাছ আমলের খেলাফ। হোদায়বিয়ার সন্ধির সময় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিসমিল্লাহ লেখার আদেশ করেছিলেন। মুশরিকরা আপত্তি করে বলেছিল, اكتب ما كنت تكتب باسمك اللهم এ থেকে প্রমাণ হয়, ইসলামে ‘বিসমিল্লাহ’ লেখাই নির্ধারিত। এর পরিবর্তে অন্য কোনো শব্দ লিখলে বিসমিল্লাহর ছওয়াব পাওয়া যাবে না এবং সুন্নত আদায় হবে না। ৫ রবিউল আওয়াল ১৪০১ হি. (আহসানুল ফাতাওয়া খন্ড ৮, পৃ. ২৪) আমি আমার তালিবে ইলম ভাইদের খিদমতে আকাবিরের কথা পৌঁছে দিলাম। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে আমলের তাওফীক দান করুন। আমীন।
জয়যাত্রা বিডি নিউজ/ডেস্ক/ডে/শি/নি/হৃদি/ক

মন্তব্য করুন

উত্তর দিন