শিক্ষা আইন ও প্রকাশনা শিল্প

শিক্ষা আইন ও প্রকাশনা শিল্প

0 280

দেশে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বা শিক্ষানীতি প্রবর্তিত হলেও ২০১০ সালের শিক্ষানীতির আগে কোনো শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট বা শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন অথবা শিক্ষানীতিভুক্ত বিষয়গুলোকে আইনগত ভিত্তি দেওয়ার কোনো উদ্যোগ গৃহীত হয়নি।

এদিক থেকে সরকার কর্তৃক সাম্প্রতিক শিক্ষা আইন ২০১৬ প্রবর্তনের উদ্যোগ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসার দাবিদার। তবে প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের খসড়ায় সৃজনশীল অনুশীলনমূলক সহায়ক বই আর নোট-গাইড বইকে একই মাপকাঠিতে ফেলে বিধিনিষেধ আরোপের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে তা শিক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

প্রসঙ্গত জেনে নেওয়া যাক, নোট-গাইড ও সৃজনশীল অনুশীলনমূলক সহায়ক বইয়ের পার্থক্য। নোট-গাইড হলো পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুর আলোকে কেবল পরীক্ষার জন্য সম্ভাব্য প্রশ্নাবলির উত্তর সংবলিত বই। এ বইগুলোতে পাঠ্যবইয়ের অনুশীলনীর প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া থাকে। শিক্ষার্থীরা এ প্রশ্নগুলোর উত্তর হুবহু মুখস্থ করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে।

অন্যদিকে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু ও শিখনফলের ভিত্তিতে নতুন পরিস্থিতিযুক্ত সৃজনশীল প্রশ্ন, নমুনা উত্তর, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেরা মানের পরীক্ষার প্রশ্ন ও তার নমুনা উত্তর এবং নিজে নিজে উত্তর করার জন্য প্রশ্নব্যাংক সংবলিত বই হলো সৃজনশীল অনুশীলনমূলক সহায়ক বই।

সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিখনফলের আলোকে অনুচ্ছেদ, প্রশ্ন ও উত্তর ঈড়হঃবহঃ এবং ঈড়হঃবীঃ-এর ওপর ভিত্তি করে হয়ে থাকে। অনুশীলনমূলক বইয়ে শিখনফলকে কেন্দ্র করে পর্যাপ্তসংখ্যক সৃজনশীল নমুনা প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়া থাকে। এ ছাড়া থাকে উত্তর সংকেতসহ প্রশ্ন।

আবার নমুনা প্রশ্নগুলো অনুশীলনের পর শিক্ষার্থীরা যাতে নিজেরাই প্রশ্নের উত্তর লেখার দক্ষতা যাচাই করতে পারে সে জন্য এসব বইয়ে থাকে প্রশ্নব্যাংক অংশ। সম্প্রতি শিক্ষা আইন সংস্কারের মধ্য দিয়ে নোট-গাইড বইয়ের জন্য নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইতিপূর্বে নোট বুকসের (প্রো-হেবিট্যাশন) এসিটি-১৯৮০-এর মাধ্যমে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত নোট-গাইড নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে কয়েকটি বিখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নোট-বই প্রকাশ বন্ধ করে দিলেও ওই আইন কখনোই কার্যকর হয়নি। অর্থাৎ আইনও ছিল, এর পাশাপাশি নোট-গাইডও বাজারে চালু ছিল।

বরং স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হওয়ার ফলে নিম্নমানের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের বইয়ে বাজার ছেয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থীরা ভালো মানের বই থেকে বঞ্চিত হয়ে নিম্নমানের বই পড়তে বাধ্য হয়। এতে সার্বিকভাবে নোট-গাইড বইয়ের প্রতি বিশেষজ্ঞ মহলের বিরূপ ধারণা তৈরি হয়।

এরপর শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশে ২০০৮ সাল থেকে শুরু হয় সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান কার্যক্রম, যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর মুখস্থনির্ভর লেখাপড়া থেকে মুক্তি পাওয়ার কথা। কিন্তু সৃজনশীল পদ্ধতি শুরুতেই হোঁচট খায়, এটা অপরিচিত এবং কিছুটা দুর্বোধ্য হওয়ার কারণে।

বিশেষ করে শিক্ষকদের বেশির ভাগই এ পদ্ধতিটি রপ্ত করার আগেই তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে প্রশ্ন পদ্ধতি সম্পর্কে জানা, বোঝা ও চর্চার ক্ষেত্রে বড় ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হয়। এ শূন্যতা থেকেই চালু হয় সৃজনশীল অনুশীলনমূলক বই।

প্রয়োজনের তাগিদেই শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক মহল থেকে মানসম্মত অনুশীলনমূলক বই সমাদৃত হয় এবং দেশের স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো এ জাতীয় বই প্রকাশে উদ্যোগী হয়।

প্রশ্ন উঠতে পারে, এ ধরনের সহায়ক বইয়ের প্রয়োজনীয়তা আদৌ আছে কি-না? কিন্তু যদি পাল্টা প্রশ্ন করা হয়, দরকার বা চাহিদা না থাকলে এসব বই কেনাবেচা হয় কেন? আসলে সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সমস্যার গভীরে কখনও যায়নি। খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, অনুশীলনমূলক সহায়ক বই পড়তে শিক্ষার্থীরা প্রায় বাধ্য।

এর মূল কারণ উন্নতমানের টেক্সট বইয়ের অভাব, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব, শ্রেণীকক্ষে পর্যাপ্ত লেখাপড়া না হওয়া এবং অনুশীলন বা পরীক্ষা প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক নমুনা প্রশ্নের ঘাটতি।

প্রস্তাবিত শিক্ষা বিষয়ক খসড়া আইনের সংজ্ঞা অংশের ৩১ নম্বর উপধারায় বলা হয়েছে, ‘নোট ও গাইড বই’ অর্থ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া যেসব বইয়ে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুর আলোকে শুধু বিভিন্ন পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখা থাকে এবং যা অধ্যয়ন করলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রতিভা বাধাগ্রস্ত হয়, শিক্ষার্থীরা মূল পাঠ্যপুস্তক পাঠে উৎসাহ হারায়।

প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক এবং ইবতেদায়ি স্তর সম্পর্কে আইনের ৭ নম্বর ধারার ৬ উপধারায় বলা আছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক পাণ্ডুলিপির অনুমোদন গ্রহণ করে শুধু কোনো প্রকাশক/প্রতিষ্ঠান/ব্যক্তি সহায়ক শিক্ষা উপকরণ বা সহায়ক পুস্তক বা ডিজিটাল শিখন-শেখানো সামগ্রী প্রকাশ করতে পারবেন।

কিন্তু কোনো প্রকার নোট বই বা গাইড বই প্রকাশ করতে পারবেন না। ২১ নম্বর আইনের ৫ উপধারায় বলা হয়েছে, এনসিটিবি কর্তৃক পাণ্ডুলিপির অনুমোদন নিয়ে শুধু কোনো প্রকাশক, প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি সহায়ক শিক্ষা উপকরণ বা সহায়ক পুস্তক বা ডিজিটাল শিখন-শেখানো সামগ্রী প্রকাশ করতে পারবেন। কিন্তু কোনো ধরনের নোট বা গাইড বই প্রকাশ করতে পারবেন না।

শিক্ষা আইনের খসড়ায় থাকা নোট-গাইড সম্পর্কিত এ ধারাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আইনে নোট-গাইড বন্ধের বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু সৃজনশীল অনুশীলনমূলক বইয়ের প্রকাশনার বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা বা নির্দেশনা নেই।

মনে রাখতে হবে, সরকার প্রবর্তিত সৃজনশীল পদ্ধতি বাংলাদেশে সফলভাবে বাস্তবায়নে সৃজনশীল অনুশীলনমূলক সহায়ক বইগুলো রেখেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। শিক্ষার্থীদের পাঠদানের লক্ষ্যে শিক্ষকরাও এসব অনুশীলনমূলক বইয়ে দেওয়া নমুনা প্রশ্নগুলো দেখে রপ্ত করতে পেরেছেন সৃজনশীল পদ্ধতি।

বলা যায়, এ বইগুলো প্রকাশ না হলে সৃজনশীল পদ্ধতি এতটা সফলতার মুখ দেখত না। তাই খসড়া আইনে সৃজনশীল অনুশীলনমূলক বইগুলোকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করে প্রকাশ করার সব বিধিনিষেধ থেকে মুক্ত রাখা উচিত। তা না হলে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাসহ প্রকাশনা শিল্প।

অনুশীলনমূলক বই প্রকাশ বন্ধ হলে পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা এমনকি বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ এ বইগুলো বারবার অনুশীলন করার মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা তাদের শিখনদক্ষতা অর্জন করে এবং পরীক্ষার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে থাকে।

সৃজনশীল অনুশীলনমূলক বই প্রকাশের সঙ্গে প্রায় সোয়া লাখ লোক সরাসরি জড়িত। ২২ হাজার বাইন্ডিং শ্রমিক, ২৩ হাজার প্রেস কর্মচারী এবং প্রকাশক-বিক্রেতা মিলিয়ে সারাদেশে আরও ৮০ হাজার লোক জড়িত।

এ সোয়া লাখ পরিবার মানে ৬ লাখেরও বেশি মানুষের (গড়ে প্রতি পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৫ জন হলে) জীবিকা আসে এই খাত থেকে। এ ধরনের বই জোর করে বন্ধ করা হলে প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি সেখানে কর্মরত হাজার হাজার মানুষ বেকার বা অর্ধবেকার হবে।

সৃজনশীল অনুশীলনমূলক বই বন্ধ হলে কোচিং সেন্টার ও প্রাইভেট টিউশনির হার বেড়ে যাবে। যেখানে বাজারের একটি অনুশীলনমূলক সহায়ক বই ১০০-১৫০ টাকায় কেনা যায়, সেখানে কোচিং সেন্টার ও গৃহশিক্ষকের জন্য অভিভাবকদের কয়েক গুণ বেশি টাকা খরচ করতে হবে।

অতএব, শিক্ষা আইন চূড়ান্ত করার আগে উপরোক্ত পর্যালোচনার ভিত্তিতে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা অতি জরুরি :
ক. শিক্ষা আইনে সৃজনশীল অনুশীলনমূলক বইকে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করে এর ওপর কোনোরূপ বিধিনিষেধ বা শর্তারোপ না করা।

খ. উক্ত বিষয়টি বিবেচনায় এনে প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের অনুচ্ছেদ ৭(৬), ৭(৯), ২১(৫) ও ২১(৬) বাদ দেওয়া বা সংশোধন করা।

গ. বেসরকারি প্রকাশকরা যাতে স্বাধীনভাবে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যাযে সব ধরনের সৃজনশীল অনুশীলনমূলক সহায়ক গ্রন্থ প্রকাশ ও বাজারজাত করতে পারেন, সে লক্ষ্যে প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের সংশোধনপূর্বক বিশ্বমানের ও সমতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার সহায়ক ধারা/উপধারা সংযোজন করা।

ঘ. প্রকাশকরা মানসম্পন্ন সৃজনশীল অনুশীলনমূলক বই প্রকাশ করছেন কি-না তা তদারকের জন্য একটি জাতীয় মনিটরিং সেল গঠন করা।

ঙ. সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে মেধাবী প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। শিক্ষকরা যাতে শ্রেণীকক্ষেই মানসম্পন্ন শিক্ষাদান করতে পারেন সে জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া।

সারাদেশের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, প্রকাশনাসংশ্লিষ্ট শিল্প এবং লাইব্রেরি ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার স্বার্থেই শিক্ষা আইন ২০১৬-এর নোট-গাইড সংশ্লিষ্ট উপধারাগুলো সংশোধন খুবই জরুরি। নির্বিচারে প্রচলিত নোট-গাইড ও সৃজনশীল অনুশীলনমূলক বইকে একই পাল্লায় ফেলে অনুরূপ আইন প্রণীত না হোক_ সংশ্লিষ্ট সবার এটাই প্রত্যাশা।

(দৈনিক সমকাল থেকে নেওয়া)

লেখক
কামরুল হাসান শায়ক
নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি

মন্তব্য করুন

উত্তর দিন